পারভেজ আহমদ ::: বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবন আর পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন এই তিনটি শব্দই প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীকে দেশের সীমানা পেরোতে উৎসাহিত করে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই ওত পেতে থাকে সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র। চাকরির বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি কিংবা পরিচিত মানুষের মাধ্যমে গড়ে তোলা বিশ্বাস সবকিছুই ব্যবহার করা হয় একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার অংশ হিসেবে। বিদেশে পৌঁছানোর পর অনেকেরই ভেঙে যায় স্বপ্ন। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, জোর করে কাজ করানো হয়, আর অমানবিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে কাটে প্রতিটি দিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানব পাচার এখন আর আগের মতো শুধু সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ নয়। এটি এখন আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অন্যতম লাভজনক ব্যবসা। প্রযুক্তির বিস্তার, অনলাইন যোগাযোগ এবং ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করেছে। একসময় দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। এখন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ, ইংরেজিতে পারদর্শী এবং ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণীরাও এই চক্রের শিকার হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার বেশিরভাগ ঘটনায় প্রথমে তৈরি করা হয় বিশ্বাসের সম্পর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন, মোটা বেতনের প্রতিশ্রুতি, বিনা অভিজ্ঞতায় চাকরি, দ্রুত ভিসা ও কম খরচে বিদেশ পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে আগ্রহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, কাগজপত্র সংগ্রহ এবং বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়।
বিদেশের মাটিতে নামার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। কর্মস্থলের পরিবর্তে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় নির্জন ভবন, পাহাড়ি এলাকা কিংবা নিরাপত্তাবেষ্টিত কম্পাউন্ডে। সেখানে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যারা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অনেককে দিনের পর দিন পর্যাপ্ত খাবার ছাড়া কাজ করতে বাধ্য করা হয়। কেউ অসুস্থ হলেও চিকিৎসার সুযোগ পান না। পালানোর চেষ্টা করলে মারধর, আটকে রাখা কিংবা মুক্তিপণ আদায়ের মতো ঘটনাও ঘটে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডকে ঘিরে মানব পাচারের নতুন প্রবণতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ভালো বেতনের অফিস চাকরির প্রলোভনে বিদেশে নিয়ে গিয়ে তরুণদের জোর করে অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগ করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কাজে বাধ্য করা হয় তাদের। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে চলে অমানবিক নির্যাতন। অনেকে বাধ্য হয়ে পরিবার থেকে অর্থ এনে নিজেদের মুক্ত করার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে পাচারের কৌশলও পরিবর্তিত হয়েছে। প্রেম, বিয়ে, বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস কিংবা উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক নারীকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের অনেকে শ্রমশোষণ, যৌন নির্যাতন কিংবা অন্যান্য অবৈধ কাজে বাধ্য হচ্ছেন। এসব ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি দালালচক্রের সমন্বিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অভিযানে নিয়মিত পাচারচক্রের সদস্য গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা অনেক ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। কারণ তারা একাধিক দেশে অবস্থান করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করে। ভুয়া পরিচয়, এনক্রিপটেড যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
মানব পাচারের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের জন্যও অপেক্ষা করে আরেক কঠিন বাস্তবতা। বিদেশে নির্যাতনের শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি তারা বহন করেন গভীর মানসিক ট্রমা। অনেক পরিবার বিদেশ পাঠাতে জমি বিক্রি করেছে, ঋণ নিয়েছে বা সুদে টাকা ধার করেছে। ফলে ফিরে এসে ভুক্তভোগীদের ওপর নেমে আসে ঋণ শোধের চাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক কটূক্তি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। ফলে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ সময় সংগ্রাম করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব পাচার প্রতিরোধে শুধু সীমান্তে নজরদারি বাড়ালেই হবে না। অনলাইনে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন শনাক্ত করা, দালালচক্রের ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, বিদেশগামী কর্মীদের বাধ্যতামূলক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে বিপদে পড়া বাংলাদেশিদের দ্রুত উদ্ধার, আইনি সহায়তা এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করতে হবে।
মানব পাচার আজ আর কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এবং মর্যাদাকে পণ্য বানিয়ে ফেলা একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসা। এই চক্র ভাঙতে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
Leave a Reply